সিরিয়ায় ইরানি শক্তির পতন: বিপদে পড়বে ভারত? সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ
মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ও ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজশকিয়ানের সঙ্গে
রাশিয়ার কাজানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সিরিয়ায় ইরানি শক্তির পতন এবং
এর সম্ভাব্য প্রভাবের উপর ভারতের নিরাপত্তা এবং কৌশলগত স্বার্থের ক্ষেত্রে কিছু
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সিরিয়া, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে ইরান রাষ্ট্রীয়ভাবে সক্রিয়,
এখন বেশ কিছু পরিবর্তনের মুখোমুখি হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনগুলোর ভারতীয় নিরাপত্তা
এবং কৌশলগত স্বার্থে কিভাবে প্রভাব ফেলতে পারে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
১. ইরানি প্রভাবের পতন এবং ভারতীয় কৌশল ইরান সিরিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত
অংশীদার ছিল, বিশেষ করে ২০১১ সালের পর থেকে যখন সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সিরিয়ায়
ইরান নিজের প্রভাব বিস্তার করে, যাতে তার পশ্চিমাঞ্চলে নিরাপত্তা সুবিধা বাড়ানো যায়
এবং ইসরাইল ও সৌদি আরবের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় করা যায়। ভারত, ইরান ও সিরিয়ার মধ্যে
সম্পর্ক ছিল শক্তিশালী, বিশেষত তেহরান থেকে চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে ভারতীয় পণ্য
পরিবহন এবং ব্যবসায়িক সম্পর্কের মাধ্যমে। ইরানি শক্তির পতনের ফলে, সিরিয়ার
অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হতে পারে এবং ভারতীয় স্বার্থগুলো ঝুঁকিতে পড়তে
পারে। ভারত সিরিয়ায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে মনোযোগী থাকলেও, ইরানির প্রভাব কমে গেলে
ভারতকে নতুন কৌশল তৈরি করতে হতে পারে। বিশেষত, ভারতকে মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সাথে
সম্পর্ক শক্তিশালী করতে হতে পারে, যেমন রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র, যাতে তার কৌশলগত
স্বার্থ রক্ষা হয়। ২. সিরিয়ায় সন্নিবেশিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইরান সিরিয়ায় যা কৌশলগত
আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করেছে, তা মুলত ইসরাইল এবং সৌদি আরবের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি
করেছে। সিরিয়ায় ইরানি প্রভাব হ্রাস পেলে, বিশেষ করে তেহরান তার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির
(যেমন হেজবুল্লাহ) উপর নিয়ন্ত্রণ হারালে, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তিত
হতে পারে। ভারত, সৌদি আরব এবং অন্যান্য গালফ দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের ওপর
এর প্রভাব পড়তে পারে। ৩. ভারতের ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক নীতি ভারত
দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে এবং ইরানে নিজের কৌশলগত উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা
করেছে, কারণ এটি তেল সরবরাহ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং অঞ্চলে শান্তি স্থাপনসহ নানা
কারণে গুরুত্বপূর্ণ। সিরিয়ায় ইরানি প্রভাবের পতন ভারতকে আরও সাবধানে তার নীতি
পর্যালোচনা করতে বাধ্য করতে পারে। এটি ভারতকে পশ্চিম এশিয়াতে নিজের অবস্থান নতুন
করে সাজানোর সুযোগ দিতে পারে, বিশেষত যখন চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং
ইসরাইল-ভারত সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। ৪. রাশিয়া ও পশ্চিমি শক্তির সম্পর্ক রাশিয়া
সিরিয়ায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিল, এবং সিরিয়ায় রাশিয়া ও ইরান সহযোগিতার
মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ইরানির পতন রাশিয়ার জন্যও একটি বড়
চ্যালেঞ্জ হতে পারে, কারণ রাশিয়া সিরিয়ায় একা একে গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা
হারাতে পারে। ভারত রাশিয়ার সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তাই এই
পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রাশিয়া-ভারত সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব আবারও বেড়ে যেতে পারে।
৫. ভারতের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ইরান সিরিয়ায় তার প্রভাব হারালে, ভারতকে আরও একবার
মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তার পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে হতে পারে। সিরিয়া
থেকে আসা প্রভাব, বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ এবং ইরানি সমর্থিত গোষ্ঠীগুলির কার্যক্রম,
ভারতের নিরাপত্তার জন্য বিপদ সৃষ্টি করতে পারে। ভারতকে এদিকে কৌশলগত সমন্বয় এবং
নিরাপত্তা ব্যবস্থা সমন্বয়ের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। শেষ কথা: সিরিয়ায় ইরানি শক্তির
পতন ভারতের জন্য কিছু কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, তবে এটি নতুন সুযোগও তৈরি
করতে পারে। ভারতকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করতে হবে, যাতে তার কৌশলগত
স্বার্থ রক্ষা করা যায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।